পর্ব ১: তবলার পরিচিতি: বিশ্বের প্রধানতম তাল যন্ত্রের তালিকায় তবলা শীর্ষস্থানীয় বাদ্যযন্ত্র। সারা বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা থাকলেও, এটি মূলত সাউথ-ইস্ট এশিয়ার প্রধান তাল যন্ত্র। তবলার বিভিন্ন গুণীজন এই যন্ত্রের বাজনায় ক্রমাগত বিপ্লব এর পাশাপাশি, সারা বিশ্বে এর প্রতি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দেন।
তবলার ইতিহাস নিয়ে নানা রকম কথা শোনা যায়। কোন লিখিত দলিল অথবা ছবি না পাওয়া গেলেও, লোক্মুখে, ১৮’ শতাব্দীর সুফি কবি এবং সঙ্গীতজ্ঞ, আমির খসরু কে এর জনক হিসাবে খেতাব দেয়া হয়। অন্যদিকে, এমন ধারনাও আছে, যে, সময়ের চাহিদায় ধ্রুপদি সংগীতের মূল বাদ্যযন্ত্র পাখাওাজকে দুখণ্ডে ভাগ করেই তবলার জন্ম।

[ পর্ব ১: তবলার পরিচিতি ]
তবলা দুখণ্ডে বিভক্ত একটি বাদ্যযন্ত্র, যার একাংশ তীক্ষ্ণ এবং আরেক অংশ ভারি আওয়াজ উৎপন্ন করে।
একটি কাঠের, আরেকটি তামা অথবা লোহার হয়ে থাকে, তবে আগে বায়া মাটি দিয়েও বানানো হত। কাঠের তবলা সাধারনত ডান হাতে বাজায় বলেই এর নাম ডায়া অথবা ডায়না, অন্যদিকে তুলনামুলক বড় ধাতব যন্ত্রটি বা হাতেই সাধারনত বাজানো হয় তাই এর নাম বায়া। দুটি তবলা সুর করা গেলেও, মূলত ডায়াকেই শুচারু ভাবে একটি নির্ধারিত স্কেলের “সা” তে সুরে বাধা হয়। বায়া এবং তবলা দুটোই ভেতর থেকে ফাপা বাহ খালি হয়।

ওপর থেকে দেখলে, তবলার ছাওনি তে একধরনের ঝিল্লির মাঝে কালো রঙের তুলনামূলক উঁচু কিছু দেখা যায়। এটা মূলত প্রক্রিয়াজাত পাঠার চামড়ার উপরে ভাত এবং লোহা গুড়ার এক বিশেষ মিশ্রন দিয়ে করা। এই বিশেষ কালো আকৃতির ঝিল্লির নাম, গাব অথবা সিহাই। তবলার আওয়াজের গাম্ভীর্য ধরে রাখতেই এই বিশেষ গাব। গাব এর পাশে যে হাল্কা বাদামি বর্ণের চামড়া, এর নাম কিনার অথবা কানি। তবলার উপরের জমিনের গাব , শুর এবং কিনারের আওয়াজ ভিন্ন। বিভিন্ন আঙুলের মুদ্রা দিয়ে এই বিভিন্ন আওয়াজ কাজে লাগিয়েই এই যন্ত্রের সংগীত পরিবেশিত হয়।

তবলার মূল “ময়দানের” ঠিক বাইরের দিকে যা দেখা যায়, এর নাম পাগড়ী। পাগড়ীর মূল কাজ, তবলার ময়দানের টান অব্যাহত রাখা। এর ঠিক নিচেই আমরা দড়ির মতন দেখতে পাই, এর নাম “দোওয়াল” অথবা “ছট’’। মূলত উঠ অথবা গরুর চামড়ার তৈরি এই ছটের মূল কাজ, উপরের সবকিছুর টান অব্যাহত রাখা। এই ছট এর ভিতর দিয়েই চলে যায় কাঠ দিয়ে বানানো গুটি, যা হাতুরির সাহায্যে স্থান পরিবর্তন করলে শুক্ষভাবে তবলা সুর করা যায়।
একধরনের বিশেষ গোলাকার বালিশের উপরে তবলা জোড়া বসানো হয়, এর নাম বীড়া। সাধারনত ভেতরে খড় এবং বাইরে রুচি অনুযায়ী তুলনামুলক মোটা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে এই বীড়া বানানো হয়।
তবলা বাজাতে আরো দুটি অতন্ত গুরুত্তপুরন জিনিশ যা লাগে, তা হল হাতুড়ী এবং পাওডার রাখার একটি কউটা। হাতুড়ী দিয়ে তবলার সুর বাধা, এবং পাওডার দিয়ে তবলার ময়দান মসৃণ রাখা যেন হাত আটকে না যায়।
তবলা জোড়া কেনার ক্ষেত্রে একটা বড় সুবিধা, মোটামুটি শ্বারা বিস্বেই এর দেখা মেলে। যেকোন দেশের যেকোন বাদ্যযন্ত্রের দোকানে গেলেই এক জোড়া পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, যদিও তার মান নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে খুব ভালো মানের তবলা না হলেও চলে, তবে ভালো মানের যন্ত্রের কিছু বাড়তি সুবিধা থাকে। বায়া হয় ওজন ভিত্তিক আর ডায়নার মূল বিষয় স্কেল আর ব্যাসরেখা। ভালো বায়া তে ৩.৫ কেজি ওজোন স্বাভাবিক।

ডায়না বা তবলার ক্ষেত্রে, বাড়িতে কেউ গান বাজনা করলে তার স্কেল মিলিয়ে কেনা যেতে পারে। তা না হোলে, “ডি” স্কেলের তবলা কেনার উপদেশ দেয়া যেতে পারে, কারন মৌসুমের পরিবর্তনকালে তবলার চামড়ার টান কমে নিচে চলে গেলেও, তা বাজানোর উপযোগী থাকে। মোটা দাগে, তবলার মান আওয়াজের জোয়ারি, সুর ধরে রাখার ক্ষমতা, কাঠ এবং চামড়ার গুনমান দিয়ে নির্ধারণ করা যায়।
তবলা সাধারনত ভালো মানের নিম বা শিশু কাঠ দিয়েই তৈরি করা হয়। সাউথ-ইস্ট এশিয়া তে হাজারখানেক তবলার “ব্র্যান্ড” বেশিরভাগেরই অবস্থান ভারতে। তবলা বানানো একটা কঠিন শিল্প। একটি তবলা বানাতে প্রায় ৭ দিন লেগে যায়। ভারতের বিক্ষাত তবলার কারিগর “কাসিম খান নিয়াজিকে’ তার শিল্পের জন্য সংগীত নাটক একাডেমি সম্মাননা প্রদান করে। কাসিম খান নিয়াজির ওয়েবসাইটে গেলেই, তাদের বানানো তবলা বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করা যাবে।

ব্রাণ্ডভ্যালুর কারনে, স্বাভাবিকভাবেই কাসিম খানের তবলার দাম বেশ চড়া। কলকাতার মুক্ত দাসের রিদম তবলা, মহারাজা তবলা সহ আরও অনেকের তবলাই হয় দুর্দান্ত। উস্তাদ জাকির হুসেইন, পন্দিত স্বপন চৌধুরী, পন্ডিত অনিন্দ্য চট্টপাধ্যায় সহ এ অঙ্গনের সমস্ত শিল্পীদের তবলা এই সকল কারিগর থেকেই আসে। এক জোড়া তবলার মূল্য, পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার পর্যন্ত যেতে পারে।
তবলা গুরুকুলের প্রথম পর্বে, এই সকল বিষয় আলোচনা করেছেন রতন কুমার দাস। দেখার আমন্ত্রণ রইল।
তবলা শিক্ষার যাত্রা শুভ হোক!
