আজক আমাদের আলোচনার বিষয় তাল ও লয়। ‘তাল’ ধাতু + স্বার্থে অন্ প্রত্যয় ক’রে তাল-শব্দ নিষ্পন্ন। সঙ্গীতে ‘ভাল’-শব্দের অর্থ হলো—কাল পরিমাণ, অর্থাৎ সময়ের মাপ। নৃত্য, গীত ও বাঘে কাল ও ক্রিয়ার পরিমাণকে ‘তাল’ বলে। করতাল বা করাঘাত থেকেই ‘তাল’ শব্দটির সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। প্রাচীন সঙ্গীতশাস্ত্রে নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্রকে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রধান অঙ্গের মধ্যে একটা অঙ্গ বলেই স্বীকার করা হয়েছে। তাছাড়া, নৃত্যই হলো তালের সৃষ্টিকর্তা। নৃত্য থেকেই ভালের উৎপত্তি বা দৃষ্টি ।
তাল ও লয়

কথিত আছে, অমরনগরে ঘুরপতিসভায় দেবদেবীর নৃত্যের সময় তালের সৃষ্টি হয়। পুরুষদের নৃত্যকে ‘তাল’ নামে অভিহিত করা হয়। আর স্ত্রীলোকদের নৃতাকে ‘লাস্য’ বলা হয় ৷ এই ‘ভাল’ আর ‘লাস্য’ শব্দ দুটির আদ্যক্ষর নিয়ে ‘তাল’ শব্দের উৎপত্তি বা সৃষ্টি। পুরুষদের নৃত্য-তাণ্ডব-নৃত্য। তাণ্ডবের ‘তা’ এবং ‘লা্যের’ ‘লা’ নিয়ে যে শব্দটা হয়, সেটা হলো—’তালা’। এই ‘তালা’ থেকেই ‘তাল’।
নৃত্য থেকেই তালের সৃষ্টি। স্বর্গের দেবদেবীরা নৃত্যের অভ্যস্ত প্রিয়। নৃত্যের জন্য সেখানকার অপ্সরাগণ বিখ্যাত। তালের নৃত্যের সঙ্গে বাত্যের সমন্বয়তা রক্ষার জন্য মহাদেব অসংখ্য তালের সৃষ্টি করেন। ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রে মার্গ ও দেশী এই দু’রকম তালের কথা জানা যায়। ‘মার্গ তাল’ স্বর্গে এবং ‘দেশী তাল’ মর্ত্যে প্রচলিত । মার্গ তাল আবার পাঁচটি ভাগে বিভক্ত। যথা :
(১) চৰ্চপুট,
(২) চাচপুট,
(৩) ষটপিতাপুত্রক,
(৪) সম্পর্কোষ্টক ও
(৫) উদ্বভট্ট।
কথিত আছে—এই পাঁচটি মার্গ তাল মহাদেবের পঞ্চমুখ থেকে নির্গত হয়। ‘মাৰ্গ ভাল’ এখন কীর্তনেই প্রচলিত। ‘দেশী ভাল’ বহু প্রকারের। ভারতীয় শাস্ত্রে যা পাওয়া Activate যায়, তা থেকে বলা যায় যে, দেশী তালের অন্তর্গত প্রায় ৩৬০-এরও বেশী তাল আছে। এই তালগুলির মধ্যে কতকগুলি তাল তবলায় এবং কতকগুলি তাল পাখোয়াজের জন্য গ্রহণ করা হয়েছে।
নাট্যশাস্ত্রে তালকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এই দুটি ভাগ হলো— নিঃশব্দ ও লশদ। তালের ভেদ বা গতি-প্ৰগতি আছে। এই ভেদ বা গতি-প্রগতিই হলো গায়ক ৰা বাদকের নিয়ম-শৃঙ্খলানুযায়ী কণ্ঠে বা যন্ত্রে চলাফেরা করা। যেমন- বিলম্বিত, মধ্য, চুন ও পরদুন । আমরা অঙ্গুলে যে মাত্রা গণনা করি, তাকে সঙ্গীতশাস্ত্রে ‘ফলা’ বলে। এই ‘কলা’ বা মাত্রা গণনা নিঃশব্দেই সম্পাদিত হয়।
আর হাতের তালুতে বা হাতের আঙ্গুলের টোকাতে যখন তাল দেওয়া হয় তখন তাকে সশদ তাল বলে। তালের মধ্যে মাত্রার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী। কারণ, তালের ভাগ সম হোক আর অসম হোক, সমপদী হোক বা বিষমপদী হোক, মাত্রার সমন্বয়কে বিস্মিত করার উপায় নেই। তালের সমান অংশ বা ভাগকে মাত্রা বলে। কতকগুলি মাত্রার সমষ্টি নিয়ে আবার তাল গঠিত হয়।
ফলতঃ দেখা যায়- মাত্রা, লয় আর তাল এই তিনটি অঙ্গাঙ্গীভাবেই জড়িত। একটাকে ছেড়ে অপরটা চলতে পারে না। তাল, লয় আর মাত্রা এই তিনটি হলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের অপরিহার্য অঙ্গ । তাল সার্থক এবং প্রাণবন্ত হয় তখন, যখন লয় থাকে ঠিক। লয় ব্যতিরেকে তাল নিরর্থক ও পঙ্গু । সেইজন্য লয়ে প্রতিষ্ঠিত না হলে বেতালা হ’তে হয়। আবার লয়ের ডোরা বা গতি ঠিক থাকলেও গায়ক বা বাদকেরা বেতালা হন, অর্থাৎ তাঁরা তখন ডালের হিসেব মাথায় রাখতে পারেন না।
কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, নৃত্যের গতি অনুযায়ী তবলা বা পাখোয়াজের গতি হওয়া উচিত। তখন এই সামঞ্জস্যপূর্ণ সমগতিই বাজ্যের ( চর্মজাতীয় ) লয়কে পরিস্ফুট করে তোলে এবং সেইজন্য বাদ্যের অপর নাম ‘সংগত’ অর্থাৎ সমগত। তালের জাতিবিভাগ আছে। পাঁচটি গাভিতে তাল বিভক্ত; যথা–
(১) চতা ( ৪ মাত্রা + ২ মাত্রা) অর্থাৎ মাত্রার ভাগ ৪ মাত্রা এবং ২ মাত্রার মিশ্রিত।
(২) ভিজ (৩ মাত্রা + ২ মাত্রা ) অর্থাৎ মাত্রার ভাগ ৩ মাত্রা এবং ২ মাত্রায় মিশ্রিত ।

(৩) মিশ্র ( ৫ মাত্রা + ২ মাত্রা ) অর্থাৎ মাত্রার ভাগ ৫ মাত্রা এবং ২ মাত্রায় মিশ্রিত ।
(৪) খণ্ড (৭ মাত্রা + ২ মাত্রা ) অর্থাৎ মাত্রার ভাগ ৭ মাত্রা এবং ২ মাত্রায় মিশ্রিত ।
(৫) পঙ্কীর্ণ (৯ মাত্রা + ২ মাত্রা) অর্থাৎ মাত্রার ভাগ ১ মাত্রা এবং ২ মাত্রায় মিশ্রিত ।
