আজক আমাদের আলোচনার বিষয় লয়ের শ্রেণীবিভাগ ও ছন্দ
লয়ের শ্রেণীবিভাগ ও ছন্দ

লয়ের শ্রেণীবিভাগ :
সঙ্গীতশাস্ত্রে লয়কে মোটামুটি দশটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে । যথা :
(১) সম (বিরাম – “ধা” ২য় তাল থেকে ঘুরে ২য় তালে পড়ে। ) –
(২) বিসম ( ফাঁকে সম ফেলা। অর্থাৎ ১৬ মাত্রা ত্রিতালের ঠেকায় ৯ মাত্রায় সম ফেলা । )
(৩) অতীত (“ধা” একটা সম ঘুরে ২য় মাত্রায় পড়ে । )
(৪) অনাখাত (বোলের “ধা”র ওপর কোনো মাত্রা পড়ে না। )
(৫) আড় ( আড়ি )
(৬) বড়াড় ( বড় আড়ি-দেড়িও বলা যায় । )
(৭) কুয়াড় ( আড়ি ও বড় আড়ি মিশ্রিত । )
(৮) আকাল (১৬ মাত্রার ওপর “ধা” ফেলা । )
(৯) আচাঞ্চক ( সোয়াইয়া — ১০ মাত্রার বোল ১৬ মাত্রায় ব্যবহার করা। )
(১০) রঙ্গ (পান্নাদার গৎ -ত্রিপরী, চৌপল্লী ইত্যাদি।)
ছন্দ
আমরা যখন কথা বলি, তখন তারও একটা ছন্দ থাকে। ঝড়ে গাছের পাতা নড়ে, তারও একটা ছন্দ থাকে। বৃষ্টি টিপটিপ করে পড়ে, তারও একটা ছন্দ থাকে । টেবিলের ওপর টেবিল পাখা যখন ঘোরে তখনও তার একটা ছন্দ থাকে। তুমুল ঝড় যখন ওঠে, তখনও তার একটা ছন্দ থাকে। সমুদ্রের ঢেউ যখন বহে, তখনও তার একটা ছন্দ থাকে। মোট কথা, ছন্দ বলতে সাধারণতঃ আমরা বুঝি—অভিপ্ৰায়, বশুতা বা স্বাচ্ছন্দ্যভাব।
কবিতায় নানা প্রকার ছন্দ আছে। অনুষ্টুপ ছন্দ, পরার ছদ, অমিত্রাক্ষর ছন্দ ইত্যাদি। এক-এক প্রকার ছন্দের এক-এক প্রকার অনুভূতি এবং মাদকতা আছে। সঙ্গীতশাস্ত্রে ক্রিয়াত্মক ক্ষেত্রে ছন্দের মূল্য সবচেয়ে বেশী। নানা- রকম ছন্দ করে যে গায়ক বা ৰাদক গান গাইতে বা বাজনা বাজাতে পারেন, তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অনায়াসে প্রমাণিত হয় ৷ বলতে বাধা নেই যে, তবলা ও পাখোয়াজে যেসব বোল-বাণী ব্যবহার করা হয়, তা নানাপ্রকার ছন্দের দ্বারা তৈরী।
সব বোল-বাণীর ছন্দের নাম জানা ও তাকে আরও করা কোনো গায়ক বা বাদকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের তাৎপর্য এতই গভীর যে, তাকে সমগ্র এবং সুষ্ঠুভাবে অনুধাবন করা কোন ব্যক্তির পক্ষেই এক বা দু’জন্মের সাধনায় সম্ভব নয়। মানুষের জীবনের পরমায়ুই বা কতটুকু ! এই অল্প সময়ের সাধনায় ভারতীয় সঙ্গীতশাস্ত্রের গূঢ়তত্ত্ব জানা সম্ভব নয়। তবু ছন্দ সম্বন্ধে যতটুকু না জানলে কোনো তবলাৰাদকের চলে না, ততটুকু এখানে আলোচনা করছি।
কণ্ঠসঙ্গীত এবং যন্ত্রসঙ্গীতে ব্যবহৃত প্রতিটি তাল এক বা একাধিক ছন্দের দ্বার। গঠিত। ছন্দ সাধারণতঃ হু’ রকম—সমছন্দ এবং বিষমছ । যে ছন্দের গতির মি আছে, তাকে বলে সমছন্দ। অর্থাৎ যে-সব ছন্দের মাত্রার সন্নিবেশ একগুণ, দ্বিগুণ বা চতুর্গুণ বা যে ছন্দের তালকে দুই দিয়ে ভাগ করে মিলে যায়, সে ছন্দ হলো সমছন্দ । সমপদী তালের (ত্রিতালা, ভেলোছাড়া, আড়াঠেকা, যত্, কাহারবা প্রভৃতি তাল) ছন্দগুলি হলো সমছনা। অর্থাৎ ছন্দের পরিবর্তন নেই। একই গতিতে সেই ছন্দ চলাফেরা করে।
কিন্তু মুস্কিল হলো বিষমছন্দকে নিয়ে। এই ছন্দের গতিধারা একরকম থাকে না । বিষমছন্দকে অনেকে আবার কূটছন্দও বলেন! এই ছন্দের গতিধারার মিল নেই। সোজা যেতে যেতে হঠাৎ বাঁকা পথ ধরে। পূর্বে যে লয়ের পাঁচ রকম জাতিবিভাগ দেখিয়েছি, এই বিষমছন্দ লয়ের চতন্ত্র জাতি ছাড়া, বাকি চারটি জাতির অন্তর্গত। কখন কখনও বিষমছন্দের প্রথম দিকটা লয়ের চতস্র জাতির ছন্দের মধ্যে। বিষমছন্দের মধ্যে পড়ে —সোয়াগুণ ছন্দ, দেড়গুণ ছন্দ, আড়াইগুণ ছন্দ, তিনগুণ ছন্দ প্রভৃতি। এই ছন্দগুলি আড়ি ছন্দ।
আড়ি ছন্দ আবার পাঁচ রকমের। যথা- আড়ি, কুন্নাড়ী, বড়াড়, জন্ম ও খ । । । সমছন্দের মধ্যে বিষমছন্দের যখন আড়িছন্দের ক্রিয়াকলাপ থাকে, তখন তাকে বলে ছন্দবৈচিত্র্য। এগুলি হলো পুরোপুরি লয়কারী ব্যাপার। মোটকথা, ছন্দ বলতে সাধারণত: আমরা বুঝি — সৌন্দর্য বিকাশ । যে গায়ক বা বাদক নানারকম ছন্দের কাজ লয় এবং তালের ঐতিহ্য বজায় রেখে দেখাতে পারেন, সেই গায়ক বা বাদকের প্রশংসা এবং স্তুতির সীমা থাকে না ।

তবে একটা কথা, তবলা ও পাখোয়াজে যতরকম বিষমছন্দের কাজ করা সম্ভব, কণ্ঠসঙ্গীতে বা যন্ত্রসঙ্গীতে ততরকম সম্ভব নয়। যন্ত্রসঙ্গীত মানে সেতার, সরোদে বিচক্ষণ ও লয়দার শিল্পী বিলক্ষণ লয়কারী করেন। তবে তবলা ও পাখোয়াজের মতো নয়। আমি জানি, বহু নামকরা ওস্তাদ সেতার ও সরোদশিল্পী তবলা ও পাখোয়াজ উত্তমরূপে শিক্ষা করে তবলা ও পাখোয়াজের ছন্দবৈচিত্র্যের বোল- ৰাণী, সেতার ও সরোদে তাঁদের রাগ-রাগিণী অনুযায়ী খাপিয়ে নিয়েছেন।
