তবলার স্বরলিপি বা বোল বাণীর বিন্যাস হলো এই বাদ্যযন্ত্রের প্রাণ। তবলা একটি অতি সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ তালবাদ্য, যার প্রতিটি আঘাত থেকে সৃষ্টি হয় নির্দিষ্ট কিছু শব্দ বা ‘বর্ণ’। এই বর্ণগুলোকে যখন নির্দিষ্ট চিহ্নের মাধ্যমে লিখে প্রকাশ করা হয়, তখন তাকেই বলা হয় তবলার স্বরলিপি।
Table of Contents
১. তবলার বর্ণ বা মূল বাণী
তবলার স্বরলিপি বুঝতে হলে প্রথমেই এর বর্ণগুলো সম্পর্কে জানতে হয়। তবলার শব্দগুলোকে সাধারণত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
ডান হাতে বাজানো বর্ণ: না, তা, তিঁ, তূ, তে, টে, রে, নে।
বাম হাতে (বাঁয়ায়) বাজানো বর্ণ: ঘে, গে, ক, কি, কৎ।
উভয় হাতে একসাথে বাজানো বর্ণ: ধা (না + ঘে), ধি (তিঁ + ঘে), ধে (তে + ঘে)।
এই বর্ণগুলোর সমন্বয়েই তৈরি হয় বিভিন্ন তালের বাণী বা বোল।
২. স্বরলিপি পদ্ধতি (Notation Systems)
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে তবলার স্বরলিপি লেখার জন্য মূলত দুটি পদ্ধতি সর্বাধিক জনপ্রিয়:
ক. পণ্ডিত ভাতখণ্ডে পদ্ধতি
এটি সবথেকে প্রচলিত পদ্ধতি। এখানে তালের মাত্রা, বিভাগ এবং ছন্দকে নির্দিষ্ট চিহ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।
সম (তাল শুরুর প্রথম মাত্রা): ‘×’ চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
তালি: ২, ৩ বা ৪ সংখ্যা দিয়ে পরবর্তী তালিগুলো বোঝানো হয়।
খালি (ফাঁক): ‘০’ চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
বিভাগ: খাড়া দাগ (|) দিয়ে তালের বিভিন্ন ছন্দ বিভাগ আলাদা করা হয়।
খ. পণ্ডিত বিষ্ণু দিগম্বর পলুস্কর পদ্ধতি
এই পদ্ধতিটি কিছুটা জটিল এবং এতে তালের লয় বা গতির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। মাত্রা ও উপ-মাত্রার মান বোঝাতে বিভিন্ন সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ভাতখণ্ডে পদ্ধতিটিই বেশি সহজবোধ্য।
৩. লয় এবং মাত্রার বিন্যাস
তবলার স্বরলিপিতে লয় বা গতির গুরুত্ব অপরিসীম। লয় অনুযায়ী স্বরলিপি লেখার ধরন বদলে যায়:
একগুণ (ঠাহ): একটি মাত্রায় একটি বর্ণ। (যেমন: ধা ধি ধি ধা)
দ্বিগুণ: একটি মাত্রার সময়সীমায় দুটি বর্ণ। এটিকে স্বরলিপিতে অর্ধচন্দ্রাকৃতি চিহ্ন ( ⁀ ) দিয়ে জোড়া লাগানো হয়।
চৌগুণ: একটি মাত্রায় চারটি বর্ণ।
৪. তবলার বিভিন্ন অলংকার ও বন্দিশ
স্বরলিপির মাধ্যমে তবলার বিভিন্ন বিশেষ বাজনা লিপিবদ্ধ করা হয়:
কায়দা: এটি তবলার একটি ব্যাকরণগত বিস্তার। একটি মূল বোলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ‘পল্টা’ বা বিন্যাস তৈরি করা হয়।
তেহাই: কোনো বোলের ক্ষুদ্র অংশকে পরপর তিনবার বাজিয়ে ‘সম’-এ এসে শেষ করাকে তেহাই বলে। এটি স্বরলিপিতে অত্যন্ত গাণিতিক নির্ভুলতায় লেখা হয়।
পেশকার ও টুকরা: তবলার একক বাদনের শুরুতে পেশকার এবং গতির বৈচিত্র্য আনতে ছোট ছোট ‘টুকরা’ ব্যবহৃত হয়।
৫. স্বরলিপির গুরুত্ব
তবলার শিক্ষা মূলত ‘গুরু-শিষ্য’ পরম্পরায় শ্রুতি বা শোনার ওপর নির্ভরশীল হলেও, স্বরলিপির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য:
সংরক্ষণ: প্রাচীন ও দুষ্পাপ্য বন্দিশগুলো চিরস্থায়ীভাবে ধরে রাখা যায়।
চর্চা: জটিল কায়দা বা রেলা মনে রাখার জন্য স্বরলিপি সহায়ক।
গবেষণা: সংগীতের তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য স্বরলিপি জানা প্রয়োজন।
তবলার স্বরলিপি কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়, বরং এটি তালের একটি গাণিতিক ও নান্দনিক মানচিত্র। একজন বাদক যখন এই স্বরলিপি পাঠ করেন, তখন তিনি কেবল বোলগুলোই পড়েন না, বরং তালের অভ্যন্তরীণ ছন্দ এবং লয়কেও অনুভব করেন। শুদ্ধভাবে তবলা শিখতে হলে বর্ণমালা চেনার মতোই স্বরলিপি পদ্ধতি আয়ত্ত করা জরুরি।